ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মানি।
ইক্ষদে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ।।
গীতা ৬,২৯
তৃতীয় দর্শন ------ নরেন্দ্র, ভবনাথ, মাস্টার
মাস্টার তখন বরাহনগরে ভগিনীর বাড়িতে ছিলেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করা অবধি সর্বক্ষণ তাঁহারই চিন্তা। সর্বদাই যেন সেই আনন্দময় মূর্তি দেখিতেছেন ও তাঁহার সেই অমৃতময়ী কথা শুনিতেছেন।ভাবিতে লাগিলেন, এই দারিদ্র ব্রাহ্মণ কিরূপে এইসব গভীর তত্ত্ব অনুসন্ধান করিলেন ও জানিলেন? আর এতো সহজে এই সকল কথা বুঝাইতে তিনি এ পর্যন্থ কাহাকেও কখনও দেখেন নাই। কখন তাহার কাছে যাইবেন ও আবার তাঁহাকে দর্শন করিবেন এই কথা রাত্র-দিন ভাবিতেছেন।
দেখিতে দেখিতে রবিবার, ৫ই মার্চ, আসিয়া পড়িল। বরাহনগরের নেপাল বাবুর সঙ্গে বেলা ৩টা ৪টার সময় তিনি দক্ষিণেশ্বরের বাগানে আসিয়া পৌছিলেন। দেখিলেন,সেই পূর্ব পরিচিত ঘরের মধ্যে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ছোট তক্তপোষের উপর বসিয়া আছেন। ঘরে একঘর লোক। রবিবার অবসর হইয়াছে তাই ভক্তেরা দর্শন করিতে আসিয়াছেন। এখনও মাস্টারের সঙ্গে কাহারও আলাপ হয় নাই, তিনি সভামধ্যে এক পার্শে আসন গ্রহণ করিলেন। দেখিলেন, ভক্তসঙ্গে সহাস্য বদনে ঠাকুর কথা কহিতেছেন।
একটি ঊনবিংশতিবর্ষ বয়স্ক ছোকরাকে উদ্দেশ করিয়া ও তাহার দিকে তাকাইয়া ঠাকুর যেন কত আনন্দিত হইয়া অনেক কখা বলিতেছিলেন। ছেলেটির নাম নরেন্দ্র, কলেজে পড়েন ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত করেন কথাগুলি তেজঃপরিপূর্ণ। চক্ষু দুটি উজ্জ্বল। ভক্তের চেহারা।
মাস্টার অনুমানে বুঝিলেন যে, কথাটি বিষয়াসক্ত সংসারী ব্যক্তির সন্মন্ধে হইতেছিল। যারা কেবল ঈশ্বর ঈশ্বর করে, ধর্ম ধর্ম করে তাদের ঐ সকল ব্যক্তিরা নিন্দা করে। আর সংসারে কত দুষ্ট লোক আছ, তাদের সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করা উচিত, এসব কথা হইতেছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ ( নরেন্দ্রের প্রতি ) — নরেন্দ্র! তুই কি বলিস? সংসারী লোকেরা কত কি বলে। কিন্তু দেখ, হাতী যখন চলে যায়, পিছনে কত জানোয়ার কত রকম চিৎকার করে। কিন্তু হাতী ফিরেও চায় না। তোকে যদি কেঊ নিন্দা করে, তুই কি মনে করবি?
নরেন্দ্র — আমি মনে করব, কুকুর কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ ( সহাস্যে ) — না রে, অতো দূর নয়। (সকলে হাস্য )। ঈশ্বর সর্বভূতে আছেন। তবে ভাল লোকের সঙ্গে মাখামাখি চলে ; মন্দ লোকের কাছ থেকে তফাত থাকতে হয়। বাঘের ভিতরেও নারায়ন আছেন ; তা বলে বাঘকে আলিঙ্গন করা চলে না।(সকলে হাস্য)। যদি বল বাঘ তো নারায়ন, তবে কেন পালাবো। তার উত্তর — যারা বলছে ‘পালিয়ে এসো ‘ তারাও নারায়ন, তাদের কথা কেন না শুনি?
একটা গল্প শোন। কোন এক বনে একটি সাধু থাকেন। তাঁর অনেকগুলি শিষ্য। তিনি একদিন শিষ্যদের উপদেশ দিলেন যে, সর্বভূতে নারায়ন আছেন, এইটি জেনে সকলকে নমস্কার করবে। একদিন একটি শিষ্য হোমের জন্য কাঠ আনতে বনে গিছলো। এমন সময় একটা রব উঠলো, ‘ কে কোথায় আছ পালাও —- একটা পাগলা হাতী যাচ্ছে।’ সবাই পালিয়ে গেল, কিন্তু শিষ্য পালাল না! সে জানে যে, হাতীও যে নারায়ন, তবে কেন পালাবে? এই বলে দাঁড়িয়ে রইলো। নমস্কার করে স্তব- স্তুতি করতে লাগল। এদিকে মাহুত চেঁচিয়ে বলছে ‘ পালাও, পালাও’; শিষ্যটি তবুও নড়লো না। শেষে হাতীটা শুঁড়ে করে তুলে নিয়ে তাকে একধারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল। শিষ্য ক্ষতবিক্ষত হয়ে ও অচৈতন্য হয়ে পড়ে রইলো।
এই সংবাদ পেয়ে গুরু ও অন্যান্য শিষ্যরা তাকে আশ্রমে ধরাধরি করে নিয়ে গেলো। আর ঔষধ দিতে লাগল। খানিকক্ষণ পর চেতনা হলে ওকে কেউ জিজ্ঞাসা করলে, তুমি কেন হাতী আসছে শুনে চলে গেলে না? বললে, গুরুদেব যে আমায় বলে দিয়েছিলেন যে, নারায়নই মানুষ, জীব জন্ত সব হয়েছেন। তাই আমি হাতী নারায়ন আসছে দেখে সেখান থেকে সরে যাই নাই। গুরু তখন বললেন, বাবা, হাতী নারায়ন আসছিল বটে, তা সত্য ; কিন্তু বাবা মাহুত নারায়ন তো তোমায় বারন করেছিল। যদি সবই নারায়ন তবে তার কথা বিশ্বাস করলে না কেন ? মাহুত নারায়নের কথাও শুনতে হয়।( সকলের হাস্য )
শাস্ত্রে আছে ‘ আপো নারায়ণঃ’ —জল নারায়ণ।কিন্তু কোন জল ঠাকুর সেবায় চলে ; আবার কোন জলে আঁচান, বাসন মাজা, কাপড় কাচা কেবল চলে ; কিন্তু খাওয়া বা ঠাকুর সেবায় চলে না। তেমনি সাধু, অসাধু, ভক্ত, অভক্ত,সকলেরই হৃদয়ে নারায়ন আছেন। কিন্তু অসাধু,অভক্ত, দুষ্টলোকের সাথে ব্যবহার চলে না। ঐরূপ লোকের কাছ থেকে তফাতে থাকতে হয়।
একজন ভক্ত —–মহাশয়, যদি দুষ্ট লোকে অনিষ্ট করতে আসে বা অনিষ্ট করে, তা হলে কি চুপ করে থাকা উচিত?
