তখন আমার ঠাকুরের উপর অভিমান এল, ভাবলাম-ঠাকুর তো সর্বাবস্থায় আমাকে দেখছেন। তিনি যদি এ জীবন রক্ষা না করেন তো এ জীবন যাক্ আর থাক্। এই ভেবে দুর্গম পথেই গেলাম। ঠাকুর রক্ষা করলেন; পথে কিন্তু প্রাণনাশের অনেক চিহ্ন দেখলাম। দু-এক স্থানে কোথাও রক্তমাখা কাপড়, কোথাও মানুষের কাচা হাড় মাংস পড়ে রয়েছে।
এই সময় একবার এক পার্বত্য গ্রামের নিকট মনােনীত একটি সুন্দর জায়গায় ধ্যানে অতিবাহিত করবেন ভেবে গঙ্গাধর বসে গেলেন।
একটি বাঘ কয়েকদিন হতে গ্রামের উপর অত্যাচার করছিল বলে গ্রামবাসিগণ সন্ত্রস্ত। নির্জনে রাত্রিকালে সাধু ধ্যানস্থ থাকলে বাঘ তার অনিষ্ট করতে পারে। তাহা হলে সাধু-হত্যার পাপ তাহাদেরই হবে। এইরূপ ভেবে গ্রামবাসিগণ কান্নাকাটি করে তাকে উন্মুক্ত প্রান্তর হতে ঘরে আসতে বললেন। কোমলপ্রাণ গঙ্গাধর সকলের এইরূপ অনুনয়ে গ্রামে একজনের একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে আশ্রয় নিলেন।
এদিকে বাঘের উৎপাতে ও ভয়ে গ্রামবাসীরা চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে দিল; তার ধোঁয়ায় প্রকোষ্ঠের মধ্যে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর, ধ্যান করা তাে দূরের কথা। এরূপ অবস্থাষ গঙ্গাধরের মনে হল, ‘কি! আমি প্রাণভয়ে এখানে পালিয়ে এসে ঈশ্বর চিন্তা করছি। তখনই তিনি বাহির হয়ে পুর্বমননানীত স্থানে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সারারাত্রি নির্জনে ধ্যানে কেটে গেল। সকালে গ্রামবাসীরা এসে সাধুকে জীবন্ত দেখি নিশ্চিন্ত ও পুলকিত হল। দুধ ও চা দিয়ে তাকে আপ্যায়িত করল। আর কেউ কোনদিন তাকে বাধা দিতে সাহসী হয় নি।
হিমালয়ের এই দুর্গম স্থানটির নাম ‘দশরথী ডাণ্ডা’—লাঠির মতো একটি খাড়া শিখর। এ স্থানের নামও সকলে জানে না, এবং সকলে এদিকে আসেও না। স্থানটি ব্যাঘ্ৰ ভল্লুক প্রভৃতি হিংস্ৰজন্তু-সমাকুল। এখানে তিন রাত্রি গঙ্গাধর ধ্যানে অতিবাহিত করেন। এক জ্যোৎস্নাবিধৌত রজনীতে এখানে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তাঁর এক অপূর্ব দর্শন হয় এ সম্পর্কে তিনি বলতেন।
সহসা অনুভব করলাম-
ঠাকুর পিছনে দাঁড়িয়ে, তাঁর কাধের উপর কাপড়ের পুঁটটি। ঠাকুর বলছেন, ‘দ্যাখ,পুরুষ-প্রকৃতি অনাদি অনন্তলীলা।
হিমালয় যেন পুরুষ আর বৃক্ষলতা ফুলফল যেন প্রকৃতি। একেই বলে পুরুষের উপর প্রকৃতির নৃত্য।’ এই বলে তিনি গান ধরলেন—
বাজবে গাে মহেশের বুকে, নেমে দাড়া, আর নাচিস নে নে খ্যাপা মাগী।
মরে নাই শিব বেঁচে আছেন, মহাযােগে আছেন যােগী।
যা দেখি তাের নাচনের জোর, নেচে ভাঙলি শিবের পাঁজর।
বিষ-খেকোর আর নাইকো সে জোর—সাধ করে কি মুদে আঁখি।
ঠাকুর আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে রয়েছেন, আর এই গানটি গাইছেন। সেদিন যে কি বিমল আনন্দে রাত কেটে গেল—তা বর্ণনা করতে পারি না।
অবর্ণনীয় দিব্য আনন্দে এইরূপে হিমালয়ের দুর্গম তীর্থসকল দেখতে দেখতে কয়েক মাস কেটে গেল। ১৮৮৮ খৃঃ মে মাসে বদরীনাথের পথ খুলতেই গঙ্গাধর সেখানে গিয়া উপস্থিত হলেন। তপােভূমি হিমালয়ের প্রাণকেন্দ্র বদরিকাশ্ৰম তাঁকে বারংবার আকর্ষণ করছে। এবার এই পুণ্যক্ষেত্রে তিন মাস তপস্যায় কাটিয়ে কৈলাস দর্শনের আকাঙ্ক্ষায় গঙ্গাধর জুলাই মাসে শিপছিলাম পাস দিয়ে তিব্বতের দাবা জেলায় প্রবেশ করলেন। তথা হতে লাসা যাবার চেষ্টা করলে স্থানীয় পুলিশ তাকে বৃটিশের চর মনে করে বাধা দেয় এবং আটক করে। ব্যবসায়ী বন্ধুরা জামিন নিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেয়। পুলিশ তাকে লাসা যেতে নিষেধ করে, তবে কৈলাস ও মানস-সরোবর দর্শনের অনুমতি দেয়।
অতঃপর গঙ্গাধর এক ব্যবসায়ী দলের সহিত কৈলাস ও মানস-সবােবর দর্শন করবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এ পথে চোর-ডাকাতের উপদ্রব, সে জন্য খুব শঙ্কিত হয়ে চলতে হয়। একদিন সত্যই বিপদ দেখা দিল। গঙ্গাধর ডাকাতের হাতে পড়লেন। শেষে উপস্থিত-বুদ্ধি সহায়ে তাহাদের গুড় ও চালভাজা খাইয়ে পরিত্রাণ পান।
এরূপ বিপৎসঙ্কুল পথে চলতে চলতে পরিশেষে শিব-পার্বতীর নিত্যধামে উপনীত হয়ে কৈলাস-শৈলের অপার গাম্ভীর্য ও মহিমায় পরিব্রাজক মহাদেবের ধ্যানে মগ্ন হলেন।
কৈলাস ও মানস-সরােবর তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলেই তুষারাবৃত মালভূমিতে অবস্থিত। কৈলাস প্রদেশে বসতি অত্যন্ত কম। মাঝে মাঝে তুষারঝটিকায় শৈত্যের সীমা থাকে না। কিন্তু দেশ অত্যন্ত গম্ভীর। জনলােকের উধ্বে এ যেন তপােলােক। এস্থান সম্বন্ধে গঙ্গাধর প্রমদদাস মিত্রকে লিখেছিলেন :
যথার্থই কড় গম্ভীর ও শান্ত। সে সকল পর্বতের ও সরোবরের দর্শন পেয়ে আপনাকে ভুলিয়াছিলাম। অত্যন্ত অপূর্ব আনন্দ। আর কি হইবে স্থানের এমনি মাহাত্ম্য যে কিছুকালের জন্য এথায় না বসিয়া গেলে কিছু করতে পারি না।— আমার অস্বাস্থ্য কিছু হয় নাই—বরং আনন্দের সহিত সকল সহ্য করিতাম।’
মানসসরােবর তিব্বতের উচ্চ মালভূমিতে তুষারগলা জলের একটি বৃহৎ স্বচ্ছ সরােবর। পরিধি প্রায় ৫০ মাইল, চারি পার্শ্বে ৮টি বৌদ্ধ মঠ। মঠে লামাদের ও নানা দেবতার বড় বড় মুর্তি। তুষারমণ্ডিত স্বয়ম্ভুলিঙ্গ
মুর্তি কৈলাস পর্বত। এই পর্বতেরও চারিপার্শ্বে ৬টি মঠ। একটি মঠের সাধু গঙ্গাধরকে বুদ্ধের একটি আসন শিখিয়ে দেন। সেই অসন করে বসলে প্রথমেই শরীর এত গরম বােধ হবে যে গায়ে কোন আবরণ রাখা যাবে না। গঙ্গাধর তাকে জিজ্ঞাসা করেন, এরূপ আসনে বসে কি করব? সেই সাধক উত্তর দেন, কিছু না, মন শূন্য কর’। যাহা হোক, এই শীতপ্রধান দেশে ঐরূপ আসন শরীর রক্ষার জন্যও একান্ত প্রযােজন।
এই দিব্যভূমিতে গঙ্গাধর কিছুদিন সাধন-তপস্যায় নিমগ্ন থাকবার প্রেরণা অনুভব করলেন। তবে এবার কোন মঠে না থেকে কৈলাসের সন্নিকটে ছেকরা’ নামক স্থানে লাসানিবাসী ভক্তিমান্ এক ধনী খাম্বার (যাযাবর) আতিথ্য স্বীকার করলেন। একদিন গঙ্গাধরের শয্যাপার্শ্বে রামকৃষ্ণের ছবিখানি দেখামাত্র উক্ত ধনী খাম্বা হাতে তুলে নিয়ে চেয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষণ জ্ঞানশূন্য অবস্থায় বসে রইলেন। জ্ঞান হলে গঙ্গাধরকে বললেন, “এ ছবি তুমি কোথাষ পেলে। এ আমার কাছে রাখ। আমি নিত্য পূজা করব। এতো সাক্ষাৎ ভগবান বুদ্ধ। নইলে একে ছুতেই আমার এমন হ’ল কেন? মানুষের এমন মুখের ভাব হয় না!’
তারপর বুদ্ধ প্রভৃতি দেবতাগণ যে সিংহাসনে থাকতেন, সেখানে ইহা রেখে ধূপ দীপ দিয়ে তিনি নিত্য পুজা করতে লাগলেন। ফিরবার সময় গঙ্গাধর তাকে না বলেই ছবিখানি নিয়ে চলে আসেন। এই ছেকরা গ্রামে পাঁচ মাস কাটিয়ে এবারও নিতি পাস দিয়া নভেম্বরের প্রথমে গঙ্গাধর আবার বদরীনারায়ণে ফিরলেন। পট’ বন্ধ হলে এবার কুমারুন, বাগেশ্বর, জাগেশ্বর, আলমােড়া, নৈনীতাল, রাণীখেত প্রভৃতি দর্শন করে তিনি কর্ণপ্রয়াগে আসলেন।
১৮৮৯ খৃস্টাব্দের শীতকাল তীর্থভ্রমণ ও সাধনভজনের দিব্য আনন্দে কাটিয়ে দশহরায় দেবপ্রয়াগ-সঙ্গমে স্নান করবার মানসে গঙ্গাধর নেমেছেন, এমন সময় গাড়োয়াল-শ্রীনগরের দেড় ক্রোশ নীচে একস্থানে স্বামী শিবানন্দের সাথে তার অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হল। তিব্বতী লামার পােষাক পরিহিত গঙ্গাধরের হিম-ঝলসানো কালো মুখমণ্ডল দেখে দূর হতে প্রথমে তিনি চিনতে পারেন নি। গঙ্গাধর ‘দাদা, দাদা বলে ডেকেয়া ওঠেন। গঙ্গা, গঙ্গা—তুই বেঁচে আছিস? তাের জন্যে যে মঠে কান্নাকাটি পড়ে গেছে— এই বলে স্বামী শিবানন্দ গঙ্গাধরকে জড়িয়ে ধরলেন। এই অবস্থায় উভয়ে কঁদতে লাগলেন। শিবানন্দ গঙ্গাধরকে নিজেদের সন্ন্যাস গ্রহণের কথা বলে তাকে তদুদ্দেশ্যে অবিলম্বে মঠে ফিরে যেতে ও সকলকে নিশ্চিন্ত করতে বলেন।
শেষ পর্যন্ত উভয়ে কেদারের পথেই হাটিলেন। কেদারের পর বদরীনাথ দর্শন করে শিবানন্দ গঙ্গাধরের বিস্তারিত সংবাদ জানিয়ে মঠে পত্র লিখে আলমােড়া অভিমুখে যাত্রা করেন। গঙ্গাধরের তখনও লাসা দর্শন করিবার আগ্রহ, তাই তিনি বদরিকাশ্রমে দুই মাস তপস্যায় কাটিয়ে নিতি পাস দিয়ে ১৮৮৯ খৃঃ জুলাই মাসে তৃতীয় বার তিব্বত প্রবেশ করলেন।
হিমালয় গঙ্গাধরের পরম প্রিয় স্থান। আবার তুষার তার প্রিয়তর। তাই তিনি বলেছেন, ‘হিমালয়! পাহাড়ের পর পাহাড় কত জায়গা চিরতুষারাবৃত। সারা বছরে সেখানকার বরফ গলে না। সাদা ধব ধব করছে—নির্মল, নিস্তব্ধ।’ গঙ্গাধরের এই স্বাভাবিক তুষাপ্রীতি তিব্বতী ও পাহাড়ীদের মুগ্ধ করেছিল। তুষার শ্রেণী অতিক্রম করে বারংবার হিমালয়ের এপার ওপার যাওয়ার দরুন তাদের মধ্যে তিনি বরফানী বাবা’ নামে পরিচিত হন।
এই সব অঞ্চলের অধিবাসিগণের অনেকেই তাহাকে চিনত ও ভালবাসত।
তিব্বতে পৌছিয়ে তিনি লাসা যাবার উদ্যোগ করলেন, কিন্তু এবার তিব্বতীদেরই অনেকে তাঁকে বৃটিশের চর মনে করে বিরূপভাব দেখাল, পুর্বের বন্ধুরাও শক্রর ন্যায় আচরণ করল। কেউ কেউ তাকে ভবিষ্যতে তিব্বতে আসিতে নিষেধ করল।
তিন তিন বার আপ্রাণ চেষ্টা করেও লাসা যেতে না পেরে তিনি তিব্বতের পশ্চিমে লাদাখের দিকে অগ্রসর হলেন। তার সুতীক্ষ্ণ নাসিকা দেখে একটি ইরানী দলপতি তাকে বলল, “ইরানী ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়ে আমাদের দলের সঙ্গে চলো, তােমায় লাসা পৌছিয়ে দেব।’ কাশ্মীরী শাল-ব্যবসায়ীরাও তাঁকে বলে, আপনাকে একটিমাত্র মিথ্যাকথা বলতে হবে যে আপনি লাদাখি মুসলমান।
তাহলে আমরা আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি। পথে কেউই সন্দেহ করবে না।’
গঙ্গাধর উত্তরে বলেন, ‘কভি নেহি হাে সাকতা ‘—অর্থাৎ আমি সাধু, আমার দ্বারা এ কাজ কখনও হতে পারে না। এইরূপে সত্যের প্রতি স্বাভাবিক নিষ্ঠাবশতঃ তখনই গঙ্গাধরের মন হতে লাসা যাবার এতদিনের বাসনা চিরতরে দূর হয়ে গেল।
১৮৮৯ নভেম্বর মাসে লাদাখে পৌছিলে তার টকটকে রং, লামার মতো পােশাক ও চেহারা এবং চারটি ভাষায় জ্ঞান জেনে স্থানীয় গভর্নর খুব খাতির করে তাকে নিজ বাড়ীতে সম্মানিত অতিথিরূপে সযত্নে আশ্রয় দিলেন।
লাদাখের ইংরেজ কমিশনারের উদু ও ফার্শী ভাষার শিক্ষক কিন্তু গঙ্গাধরকে চর সন্দেহ করে গভর্নরকে বলল, “ইনি একজন বিদেশী লােক, নিশ্চয়ই কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাইরে সাধু সেজে থাকেন, নইলে দু-তিন বছর ধরে এত কষ্ট স্বীকার করে কেন ইনি তিব্বতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন?
সেই শিক্ষক শ্বেতাঙ্গ কমিশনারকেও এই সব কথা বলল।
গভর্নর লাদাখি মুসলমান, ইংরেজকে খুব ভয় করেন। এই কারণে ঐ শিক্ষকের কথায় ভীত হয়ে দুই তিন দিন পরে হঠাৎ তিনি গঙ্গাধরকে তাঁর বাড়ী ত্যাগ করে ধর্মশালায় যেতে বললেন। এই সময় কয়েকজন কাশ্মীরযাত্রী তিব্বতী ছাড়পত্র নিতে আসে। গভর্নর গঙ্গারকে তাদের সঙ্গ ধরতে বললেন, নতুবা ধর্মশালায় এই দারুণ শীতে জীবন সংশয়। গঙ্গাধর ঐ তিব্বতীদের সঙ্গে কাশ্মীরের পথ ধরলেন। পথে এত ঠাণ্ডা যে খাবার সময় রুটী ছেড়া যায় না, হাত দুখানা আড়ষ্ট হয়ে যায়। গঙ্গাধর ভাবলেন আবার লাদাখে ফিরে যাই, কিন্তু যাত্রিগণ শীত নিবারণের জন্য তাকে তুলা-ভরা পাজামা ও গরম কাপড় দিল এবং আগুন জ্বালিয়ে তার শরীর সেকতে লাগল। অশ্বপৃষ্ঠে চলতে চলতে যেমন শ্রীনগরে কাছে এসেছেন, অমনি এক কাশ্মীরী
পণ্ডিত তাকে রাজার এক পরােয়ানা দেখিয়ে পরদিন ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দেখা করতে বলল।
এই সময় হতে কাশ্মীরী পুলিশ গঙ্গাধরের পিছু লয় এবং পরদিন সকালে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, ‘রাজার কোন দোষ নাই। ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিসকেট সাহেবের হুকুমমতো আপনাকে আটক করা হয়েছে। অনেক দিন থেকে আপনার খোঁজ করা হচ্ছে। রেসিডেন্টকে তার করা হয়েছে, উত্তর না আসা পর্যন্ত বড় কোতােয়ালিতে থাকুন। আপনার যা যা প্রয়ােজন পুলিশ থেকে পাবেন। এইভাবে পঙ্গাধরকে থানায় নজরবন্দী করে রাখা হল। তখন তার বয়স প্রায় ২৫ বৎসর।
গঙ্গাধরের বালকের মতাে কমনীয় মুখ ও সুন্দর চেহারা দেখে বড় কোতােয়ালির জমাদারের গৃহিণীর মনে বাৎসল্যের উদ্রেক হয়। তিনি তার স্বামীর নিকট দুঃখ প্রকাশ করে বলতে থাকেন, এ ছেলেমানুষ রাজনৈতিক ব্যাপারে লিপ্ত নয়। একে এ রকম কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়। গঙ্গাধর থানায় আটক থাকা কালে পুলিশের দেওয়া কোন জিনিস খেতেন না বলে তিনিই খাওয়াতেন। কয়েক দিন এইভাবে কেটে গেল।
তারপর রেসিডেন্টের হুকুম আসল—সাধুকে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা দেওয়া হবে, তবে তাকে নজরবন্দী থাকতে হবে। পৃথক বাড়ী ও লেখাপড়ার সাজ-সরঞ্জাম সব কিছু দেবার আদেশ হল। কিন্তু থানা-কর্তৃপক্ষ তদনুযায় কাজ করলেন না। তখন গঙ্গাধর বললেন, কালই আমাকে আলাদা বাড়ী না দিলে আমি না খেয়ে তােমাদের রাজত্বে মরব। আরও একদিন সেই জমাদার-গৃহিণীর নিকট ‘ভিক্ষা গ্রহণ করে তিনি জেলের মধ্যে অনশন আরম্ভ করলেন।
এদিকে থানা-কর্তৃপক্ষ রেসিডেন্টের আদেশমত কিছুই দিল না। তখন গঙ্গাধরের প্রতি স্নেহপরায়ণ। সেই নারী কাদতে কাদতে বললেন, ‘আমার দেওয়া রুটি খাও; ওদেরটা নাই বা খেলে। তদুত্তরে গঙ্গাধর বলে তােমার স্বামী ১৯ টাকা মাত্র বেতন পায়, ছা-পােষা মানুষ। দু-তিন দিন তােমাদেরই খেলাম, ‘আর খাব না। তিব্বত হতে সঙ্গে করে আনা ভালো চা ছিল। শুধু সেই চা খেয়ে পাঁচদিন পড়ে রইলেন। তবু কিছুতেই জেলের দেওয়া কোন খাদ্য খেলেন না। এ সম্বন্ধে তার নিজের উক্তি,
পাঁচ দিনের দিন রাত্রে ক্ষুধার জ্বালায় খুব কষ্ট হতে লাগল। সেই জমাদারের ছেলে রােজ আমার কাছে আসত। সেদিন আমার কষ্ট দেখে বললে ‘মহারাজ, আজ আপনার বড় কষ্ট হচ্ছে দেখছি। আমার একটা পাই পয়সা আছে, আপেল কিনে আনছি, আপনি খান। ছেলেটি দুটো বড় আপেল কিনে নিয়ে এল, তাই খেয়ে কিছু তাজা হয়ে বললুম, এই দুটি আপেল খেয়ে এখন পাঁচ দিন আবার যুঝতে পারি।’
এর পর কাশ্মীরে রামবাগে গঙ্গাধরকে পৃথক ঘর দেবার ব্যবস্থা হয়। তথায় একটি মন্দিরে যাহা ভােগ দেওয়া হত, সেই প্রসাদ তিনি পেতেন। রােজ চৌকিদার এসে এনার’ খবর নিয়ে যেত। কাশ্মীরের প্রধান মন্ত্রী আশুতােষ মিত্র ও প্রধান বিচারপতি ঋষিবর মুখোপাধ্যায় মহাশয়গণের সহিত এই রামবাগেই গঙ্গাধরের দেখা হয়।
তারাই তাঁকে লেখবার কাগজ ও কলম দেন। তখন গঙ্গাধর বরাহনগর মঠে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে সব কথা জানিয়ে পত্র লিখলেন। কাশীর প্রমদাদাস বাবুকেও এক পত্রে কাশ্মীরে তাহার আটক থাকার কথা জানিয়ে তিব্বতভ্রমণের অভিজ্ঞতার বিষয়ও লিখেছেন :
তিব্বত ভ্রমণে চিত্তের অবস্থা জানতে পারা যায় ও পরীক্ষা হয়। তিব্বতে আমার মনে আছে প্রতিবৎসর একদিন একাকী চলতে চলতে জলাভাবে তৃষ্ণায় প্রাণ যায় যায় করছিল—সে অবস্থাতেও এক অপূর্ব আনন্দ অনুভব করেছিলাম। এ অবস্থা তিন বৎসরে তিন দিন ঘটেছিল। তদ্দেশের সে গম্ভীর পবিত্রাভাবে ডুবিয়া কিছুই মনে থাকত না, অথবা ভ্রমণে নিরস্ত করতে পারত না।
গঙ্গাধরের পত্র পেয়ে বরাহনগৱ মঠের তরফ হতে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ, গিরিশবাবু এবং কাশী হতে প্রমদাদাস বাবু ও আরও দু-একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি কাশ্মীরের রাজনৈতিক এজেন্টের কাছে এই মর্মে পত্র লিখলেন, ‘ইনি আমাদের পরিচিত, মঠের সাধু-ধর্ম ছাড়া এর আর কোন উদ্দেশ্য নাই।
রেসিডেন্ট শীতের জন্য মার্চ মাস পর্যন্ত শিয়ালকোটে থাকতেন। এপ্রিল মাসে কাশ্মীরে তার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত গঙ্গাধরকে এইভাবে জরবন্দী অবস্থাতেই কাটাতে হল। এই সময় গঙ্গাধরের মনে নূতন সংকল্প জাগল—“লাসা যাওয়া যখন হলই না, তখন কারাকোরম পর্বত অতিক্রম করে প্রাচীন সভ্যতায় জন্মভূমি মধ্য এশিয়া ঘুরে আসব।
কিন্তু মঠের প্রতি চিঠিতে ফিরবার আহ্বান তার প্রাণে ধ্বনিত হতে থাকে।
নরেন্দ্রনাথের পত্রে জানলেন, তিনি গাজীপুরে পওহারী বাবার দর্শনে আসেছেন।
তিনি এই সময় গঙ্গাধরকে কখনও শাসনের সুরে লিখছেন, ‘তুমি ভ্রমণ ত্যাগ করে এক জায়গায় বসে পড়। কখনও স্নেহের প্রলেপে লিখছেন, ‘তােমার পত্রে হিমালয়ের বর্ণনা পড়ে আমার হিমালয়ভ্রমণের বাসনা হয়েছে। তুমি সব পথঘাট জান। তােমার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণ করব ও একসঙ্গে কোথাও তপস্যা করব। অতএব তুমি আমার সঙ্গে গাজীপুরে মিলিত হও। তােমাকে কতদিন দেখি নাই, ইত্যাদি। এইসব আদেশ ও অনুরোধ-পত্ৰ পেয়ে গঙ্গাধরকে তার মধ্য এশিয়া যাবার সংকল্প পরিত্যাগ করতে হয়।
নজরবন্দী অবস্থায় গঙ্গাধরকে একদিন থানা-কর্তৃপক্ষ কয়েকটি প্রশ্ন করে। ‘কেন তিব্বতে গিয়েছিলে। তিব্বতী ভাষা কিরূপে শিখলে? লামা তােমায় এত শ্রদ্ধা করে কেন?’ সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দদিয়ে শেষ প্রশ্নের উত্তরে গঙ্গাধর বলেন, সে কথা লামাদের জিজ্ঞাসা কোরো।
ইতিমধ্যে যথাসময়ে রেসিডেন্ট নিসবেট কাশ্মীরে ফিরে আসলে গঙ্গাধর তার সাথে দেখা করলেন। রেসিডেন্ট তাকে বললেন, আপনার ভ্রমণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যে নেই, তা আমি পত্রযােগে কলকাতা ও কাশী থেকে জেনেছি। আপনি এখন স্বাধীন, কলকাতা ফিরে যেতে পারেন। অথবা যদি ইচ্ছা করেন গবর্নমেন্টের তরফ থেকে আপনাকে তিব্বতে দূত করে পাঠাতে পারি। স্থানীয় বৃটিশ কর্তৃপক্ষ এই সময় গঙ্গাধরকে জায়গা দেবারও লােভ দেখান। গঙ্গাধর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমি সাধু, ভগবানের নাম করে দিন কাটাই; রাজনৈতিক কোন কিছু করা আমার দ্বারা হবে না।’
তখন রেসিডেন্ট সাহেব বলেন, ‘তাহলে তিব্বতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার সম্বন্ধে কিছু লিখে দিন। তাতেও অসম্মত হয়ে গঙ্গাধর বলে ‘একটি নিরীহ নিরুপদ্রব স্বাধীন জাতির সর্বনাশ করবার জন্য আমি লেখন ধারণ করব না। অবশেষে নিবেট সাহেব ও সরকারী কর্মচারী গঙ্গাধরের ভ্রমণকাহিনী শুনতে চান এবং তারই কিছু অংশ লিখে নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন।
মুক্ত হইবার পর আশুতোষ মিত্রের ভবনে কয়েকটা দিন কাটাবার জন্য গঙ্গাধর তার সাদর আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। তথায় নিত্ৰ-মহােদয়ার অকৃত্রিম স্নেহযত্নে তিনি হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পান এবং উভয়ের মধ্যে একটি আন্তরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাহা জীবনব্যাপী স্থায়ী হয়। এদিকে আর কখনও আসা হবে কিনা ঠিক নেই, এই ভেবে গঙ্গাধর কাশ্মীরের তীর্থগুলি—যথা ক্ষীরভবানী, মার্তণ্ড, বেরিনাগ, অনন্তনাগ প্রভৃতি একে একে দেখতে লাগলেন; কিন্তু অমরনাথ দর্শনের সময় এখন নয় বলে উহা আর হল না। এপ্রিলের শেষভাগে রাওলপিণ্ডি ও লাহাের হয়ে তিনি বারাণসী পৌছলেন।
বহুদিন পরে প্রমাদাদাস মিত্র মহাশয়ের সহিত মিলিত হয়ে উভয়ে আনন্দে বিভাের হলেন। প্ৰমদা বাবু শুনলেন অপূর্ব হিমালয় ভ্রমণকাহিনী, আর গঙ্গাধর শুনলেন বরাহনগর মঠের ক্রমােন্নতির কথা।
স্বামীজীর দর্শনাশায় কাশী হতে গাজীপুর গিয়ে গঙ্গাধর শুনলেন, তিনি মিত্র মহাশয়ের অসুখের সংবাদ পেয়ে কলকাতা চলে গেছেন। গঙ্গাধর গাজীপুরে পওহারী বাবার শান্তিময় আশ্রমে দুই তিন রাত্রি বাস করে কাশীতে প্রমদা বাবুকে লিখছেন :
গতকালও পওহরী বাবার আশ্রমে ছিলাম। তাঁর ভাষণ-শ্রবণে কৃতার্থ হয়েছি। তিনি সাক্ষাৎ বিনয়ের মূর্তি। এমন বিনীত ভাব আর কোথাও দেখি নাই। বাবাজী এ দাসের প্রতি বিশেষ কৃপা করেছেন। আমাদের নরেন্দ্র-স্বামীর বহু প্রশংসা করলেন।
শীতের দেশ হতে সহসা গরমের মধ্যে এসে এইস্থানে গঙ্গাধর সপ্তাহখানেক কমজুরী হয়ে পড়েন। কিছুটা সুস্থ বােধ করে ১৮৯০ খৃখৃষ্টাব্দের মাসের প্রথম সপ্তাহে বাহনগর মঠ অভিমুখে যাত্রা করেন। ডাক-গাড়ীতে হুগলী পর্যন্ত এসে গঙ্গাধর প্যাসেঞ্জারে উঠে বালী তে নামলেন। তাঁর ইচ্ছা গঙ্গা পার হয়ে দক্ষিণেশ্বর হয়ে বরাহনগর মঠে পৌছবেন। কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ কর্মচারী পরিব্রাজককে আটক করে হাওড়া নিয়ে চলল। সেখানে থানায় ‘আপনি কে বা কোথা থেকে আসছেন। কোথায় যাবেন
‘—এই সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদত্ত হলে পর একজন পুলিশ কর্মচারী গঙ্গাধরকে বরাহনগর মঠে নিয়ে এসে মঠের নেতা নরেন্দ্রনাথকে বলল, “আপনি দয়া করে লিখে দিন ইনি আপনাদেরই একজন গুরুভাই ইত্যাদি।
স্বামী শিবানন্দ কলম ধরে বসেই আছেন, স্বামীজী বলবামাত্র তিনি লিখতে আরম্ভ করবেন। এমন সময় স্বামীজী কাগজখানা ছিনিয়ে নিয়ে তেজোদৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘লিখে দেব আবার কী! তার তীব্র ভ্রুকুটি দেখে বেগতিক বুঝে কর্মচারীটি চলে গেল।
স্বামীজী তৎক্ষণাৎ কাশ্মীরের রেসিডেন্টকে একখানি পত্র দিলেন : ‘সাধু সন্ন্যাসীদের প্রতি এরূপ অত্যাচার হলে আমরা বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরে কোথাও কলােনি করিব। আমরা সাধু সন্ন্যাসী, ধর্মই আমাদের জীবন।
যাতে ভবিষ্যতে এরূপ অত্যাচার না হয়, তার বিহিত করবেন।’
কয়েকদিন পর কাশ্মীরের রেসিডেন্ট কলিকাতায় পুলিশ বিভাগে লিখলেন,
‘গঙ্গাধর বাবাকে (Gangadhar Bawa) আমরা জানি। তিনি সাধু। কোনরূপ রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত নন। তাঁকে সন্দেহ করবার কোন কারণ নেই। এর পর হইতে পুলিশ আর কিছু করে নি।
সুদীর্ঘ সাড়ে তিন বৎসর পরে গঙ্গাধর অবশেষে প্রাণাধিক স্বামীজী ও গুরুভ্রাতাগণের সান্নিধ্যে বরাহনগর মঠে মিলিত হলেন।
গঙ্গাধরকে পেয়ে স্বামীজী কখনও ‘গ্যাঞ্জীস’ বলে সস্নেহে সম্ভাষণ করেন,
কখনও ‘বরফানী বাবা’ বলে ডাকেন,
কখনও ‘তরােয়ালকা মাফিক নাকওয়ালা সাধু কঁহাসে
আয়া রে’ বলে আদর করেন।
এই ভাবে বিমল আনন্দে কয়দিন কেটে গেল। সকলে গঙ্গাধরের মুখে হিমালয় ভ্রমণের ও তিব্বতের বর্ণনা শুনে আনন্দিত হলেন গঙ্গাধরও মঠের একটা স্থায়ী রূপ দেখে তৃপ্তি লাভ করলেন।
স্বামী অখণ্ডানন্দ
তিব্বতে ও হিমালয়ে
