অনন্তের_যাত্রী
#স্বামী_সোমেশ্বরানন্দ
শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি পরমহংস। কেন?
হাঁস জলে ভাসতে পারে। স্থলে হাঁটতে পারে। আকাশে উড়তে পারে। উড়ে চলে যেতে পারে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে।
শ্রীরামকৃষ্ণ তেমনি এক মানুষ। তিনি গৃহী। তিনি সন্ন্যাসী। তিনি ভক্ত, যোগী, বেদান্তী। তিনি শাক্ত, তিনি বৈষ্ণব। তিনি ছবি আঁকেন, অভিনয় করেন, আবার ধ্যানে সমাধিস্থ হন। তিনি এক বহুমাত্রিক মানুষ। কোথাও বদ্ধ নন তিনি। হাঁসের মতো।
আমরা একমাত্রিক মানুষ। আমরা কেউ ডাক্তার হই, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা গায়ক। আমরা one-dimensional ম্যান। আমাদের ঘরের একটাই দরজা। ও দিয়ে বাইরে যাই, ভেতরে ঢুকি। আমরা কেউ স্থলে থাকি, কেউ জলে। অথচ আমরা জন্মেছিলাম আকাশে ওড়ার জন্য।
শ্রীরামকৃষ্ণ আমাদের ডাকছেন বহুমাত্রিক হওয়ার জন্য। আকাশে ওড়ার জন্য। তাই তিনি শুধু হংস নন, পরমহংস।
তিনি বৈষ্ণবদের সঙ্গে কীর্তন করছেন। মুসলমান হয়ে নামাজ পড়ছেন। আবার যিশুখ্রিস্টের আলোর সঙ্গে এক হয়ে যাচ্ছেন। জীবনের বহু মাত্রায় তার যাতায়াত। অথচ কোন মাত্রা, কোন স্তরেই আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন না। তিনি উঠছেন মহাকাশে। তিনি যে পরমহংস।
এই বিশ্ব, এই জীবন, এই মন — বহুমাত্রিক। অনন্ত প্রকাশের সম্ভাবনা তার। রামধনুর মতো বহু রং তার। অথচ আমরা বদ্ধ হয়ে পড়ি নিজের ছোট ঘরে, সীমিত অস্তিত্বে, একমাত্রিক জীবনে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেনঃ তোরা একঘেঁয়ে হসনি। একঘেঁয়ে হওয়া এখানকার ভাব নয়।
একদেশী বুদ্ধিকে ব্যঙ্গ করে তিনি বলতেন ‘মতুয়ার বুদ্ধি।’
ঘরের দরজা-জানালা খুলে দিলেই আসবে আলো, আসবে ফুলের গন্ধ, আসবে বাতাস। তবুও আমরা খুলতে চাই না। ভয় হয় যদি চোর-ডাকাত আসে। তাই আমরা দেখি না ঘরের বাইরে সবুজ সবুজ কচি ঘাস, বিশাল বটগাছ, পথের হাজার সৌন্দর্য। জীবন তার অজস্র সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হবে। জীবনকে আমরা দেখতে চাই না, তাকে কেটেছেঁটে নিজের মত করে নিতে চাই। অজানা রহস্যকে ভয় পাই। ‘কি’ ও ‘কেন’ জীবনের সব সৌন্দর্যকে বোঝা যায় না। কারণ জীবন মূলত রহস্যময়। আর এই রহস্যকে অনুভব করাই এক মহা আনন্দ।
… শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেকে বাউল মনে করতেন। বলতেনঃ বাউলের দল, এল গাইল নাচল, আবার চলে গেল, কেউ জানতে পারল না।
বিজ্ঞানী হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় আমরা হিসেবি হলাম। বাউল হতে পারলাম না।
তথ্যসূত্রঃ শ্রীরামকৃষ্ণ ও আজকের জিজ্ঞাসা, পৃষ্ঠাঃ ২৮-২৯, প্রকাশকঃ শ্রদ্ধা প্রকাশন
~~
