যথার্থ বিবেকানন্দ অনুসরণ
( চাই একটি আদর্শ জীবন )
ব্রহ্মচারী শুভব্রত মহারাজ
বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন
স্বামী বিবেকানন্দকে আমরা যারা আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছি কিভাবে বোঝা যাবে যে ঠিকঠিক সেই আদর্শকে অনুসরণ করছি কিনা??
স্বামী বিবেকানন্দের ফটোকে রোজ মালা পরিয়ে পূজা করা বা তার জন্মদিনে বেলুড় মঠ যাওয়া বা বিভিন্ন বক্তৃতা শোনা, তাঁর সম্পর্কে অনেক বই পড়া ....... এইগুলিই কি কেবলমাত্র স্বামিজীর আদর্শকে মেনে চলা?? কেউ 50 বার বেলুড় মঠ গেছে, 100 টা বক্তৃতা শুনেছে, 50 টা বই পড়েছে, সাধুদের সাথে, পন্ডিতদের সাথে যোগাযোগও আছে, ফেসবুক, হোয়াটস আপ এ বিভিন্ন বাণী ও কথাও পড়ে বা পোস্ট করে। সেই ব্যক্তিও কি তাহলে স্বামীজিকে অনুসরণ করছে ঠিকঠিক??
হ্যাঁ, এইগুলি অবশ্যই একধরনের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা নিশ্চিতভাবে। এইগুলি প্রাথমিক স্তর। কিন্তু যথার্থ ভাবে বিবেকানন্দকে আদর্শ হিসাবে নিতে গেলে তাঁর জীবন ও বানীর আলোকে আমাদের নিজেদের জীবন গঠন করতে হবে। তিনি ঠিক যেরকম চেয়েছেন আমাদের ঠিক সেইরকম হতে হবে বা হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। একমাত্র তখনই হবে স্বামীজিকে প্রকৃত গ্রহণ বা যথার্থ অনুসরণ। সেটাই হবে তাঁর প্রতি দেখানো সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।
- স্বামীজিকে যথার্থ যিনি অনুসরণ করবেন তার জীবন হবে সৎ ও পবিত্র।
2.সংযমের জীবন হবে। কোনো অবস্থাতেই তিনি লোভ বা কামনার বশবর্তী হয়ে সততা বিসর্জন দেবেন না। - তিনি নিঃস্বার্থপর হবেন। স্বামীজী বলছেন, “পবিত্র ও নিঃস্বার্থ হতে চেষ্টা করো তার মধ্যেই সমস্ত ধর্ম।”
- তিনি মনুষত্ববোধে পরিপূর্ণ হবেন। মানবিক হবেন। স্বামীজী বলছেন,”এসো মানুষ হও ” প্রকৃত মানুষ হতে হবে।
- তার মধ্যে থাকবে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ও সাথে ঈশ্বরে বিশ্বাস।
- তিনি অবশ্যই চরিত্রবান হবেন। স্বামীজী বলছেন, “মনে রাখবে, ব্যাক্তিগত চরিত্র ও জীবনই শক্তির উৎস অন্য কিছু নয়।”
- তিনি হবেন খুব শ্রদ্ধাশীল।
- সকলকে নিয়ে মিলেমিশে কাজ করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
- তিনি হবেন অকপট। কোনো রকম ছল বা শঠতা তার মধ্যে থাকবে না।
- তিনি হবেন সাহসী ও সহানুভুতি সম্পন্ন। খুব উদ্যমী হবেন।
- মাতৃজাতীর প্রতি তার থাকবে বিনম্র শ্রদ্ধা। মেয়েদের সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। মেয়েদের ঈশ্বরজ্ঞানে দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে হবে। শুধু তাই নয় মেয়েদের উন্নতির জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিতে হবে। স্বামীজী বলেছেন,”মেয়েদের নিচে ফেলে কেউ উঠতে পারে না।” তিনি আরো বলেছেন,” যেখানে স্ত্রী লোকের আদর নেই, স্ত্রীলোকেরা নিরানন্দে অবস্থান করে, সে-সংসারের সে-দেশের উন্নতির কখনো আশা নেই।”
- তিনি সত্য কে সর্বদা ধরে থাকবেন। কোনো অবস্থাতেই তিনি সত্যকে ছাড়বেন না। তিনি সত্যবাদী হবেন। স্বামীজী বলছেন,”সত্যের জন্য সবকিছুকেই ত্যাগ করা চলে কিন্ত কোনো কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা চলে না।”
- তিনি সরল হবেন। সরল নাহলে তিনি কখনো যথার্থ আধ্যাত্মিক হতে পারবেন না।
- তিনি সর্বদা নিজের লক্ষ্যে দৃঢ় ও অবিচল থাকবেন।
- তিনি নাম যশ ও প্রভুত্বস্পৃহা বিসর্জন দেবেন ও কাজ করবেন।
- তিনি সর্বদা দীন দরিদ্র অসহায় মানুষের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাবেন। তাদের দেবতাজ্ঞানে সেবা করবেন।
- তিনি তার মাতা পিতাকে দেবদেবী জ্ঞানে সেবা করবেন ও শ্রদ্ধা করবেন।
- তিনি প্রকৃত শিক্ষিত হবেন ও ওপরের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করবেন।
- তিনি সমদর্শী হবেন। সকলের ওপর তার সমান ভালোবাসা থাকবে। তিনি সকলকে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করবেন।
- তিনি নিজে আদর্শ জীবন যাপন করবেন ও অপরকে উৎসাহ দেবেন নৈতিক আদর্শ জীবন যাপনের জন্য। তার জীবনই হবে সকলের কাছে উদাহরণস্বরূপ।
আরও আছে। মোটামুটি এই লক্ষণগুলি বা সদগুনগুলিকে যদি জীবনে ফুটিয়ে তোলা যায় তবেই হবে স্বামী বিবেকানন্দকে যথার্থ অনুসরণ। এইগুলি যে পুরুষ বা নারীর মধ্যে প্রকাশ হতে শুরু করেছে বা অনুশীলন করছেন তাকেই বলা যাবে প্রকৃত বিবেকানন্দ অনুরাগী। তিনি একজন শিক্ষিক বা শিক্ষিকা হতে পারেন, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেন, তিনি একজন ছাত্র বা ছাত্রী হতে পারেন, তিনি একজন অফিসার বা সাধারণ কর্মী হতে পারেন, বা তিনি একজন বাবসাদারও হতে পারেন।আজকের বর্তমান সমাজে চাই এইরকম বিবেকানন্দময় বা যথার্থ বিবেকানন্দ অনুরাগী একটি আদর্শ জীবন। স্বামী বিবেকানন্দের কাছে প্রার্থনা করি অন্তর থেকে আমরা যেন ঠিকঠিক সেইরকম যথার্থ অনুরাগী হতে পারি ঠিক তিনি যেরকম চাইতেন। এইরকম জীবন যত তৈরি হবে পৃথিবীর বুকে তত পৃথিবীর সামাজিক পরিবেশ বদলে যাবে। আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সর্বক্ষেত্রে এক পবিত্র নৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এক আদর্শ নৈতিক সমাজ। শান্তি ও অহিংসার সমাজ।
