।। শিক্ষাব্যবস্থা — পরীক্ষা ।।
স্বামী প্রেমেশানন্দ
সমগ্র জাতি শিক্ষাকে পরীক্ষাপাশ মাত্র জানিয়া রাখিয়াছে এবং এই পাশের জন্য যেন উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছে। শিক্ষা ব্যাপারে কত যে দুর্নীতি প্রবেশ করিয়াছে তাহা দেখিয়া শুনিয়া স্তম্ভিত হইতে হয়। পরীক্ষা হইয়া পড়িয়াছে ঠিক যেন একটা লটারি খেলা। পরীক্ষার সময় ছেলেদের যে কি দুর্দশা হয়, তাহা দেখিয়া অত্যন্ত ব্যথা পাই।
(ক) একদিন বিকাল বেলা বহরমপুর আশ্রম-বাটীতে বসিয়া আছি। আশ্রম লাইব্রেরির একটি ছাত্র মেম্বার হঠাৎ কাঁদিতে কাঁদিতে পাগলের মতো আমার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। সে বলিল, পরীক্ষায় ফেল হইয়াছে জানিয়া তাহার দাদা খড়ম দিয়া তাহার মাথায় এমন আঘাত করিয়াছে যে, তাহা হইতে দরদর করিয়া রক্ত পরিতেছে। আমি স্তম্ভিত হইয়া ছেলেটিকে আদর করিয়া কাছে বসাইলাম। সে বলিতে লাগিল, আমি আর বাড়ি ফিরিয়া যাইব না, আপনাদের আশ্রমেই থাকিব। সারা বিকাল সে ঐখানে বসিয়া কাঁদিতে লাগিল। অবশেষে অনেক বুঝাইয়া জনৈক সাধুকে দিয়া তাহাকে তাহার মায়ের কাছে পাঠাইয়া দিলাম।
(খ) একটি ছেলে পরীক্ষায় ফেল হইয়াছে, ইহা শুনিয়া তাহার রন্ধনরতা জননী জ্বলন্ত চেলাকাঠ ধরিয়া ছেলের মুখ পোড়াইতে গিয়াছিলেন।
(গ) পরীক্ষায় ফেল হইয়া অন্য একটি ছেলে বহরমপুর স্টেশন হইতে কিছু উত্তরদিকে ট্রেনের নিচে পড়িয়া আত্মহত্যা করিয়াছিল।
(ঘ) বহরমপুর আশ্রমে একটি ছেলে সর্বদা আসিত। সে তাহার ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরের একখানি ছবি রাখিয়াছিল এবং তাহা সর্বদা প্রণাম করিত। বাৎসরিক পরীক্ষায় ফেল হওয়াতে সে ঠাকুরের উপর চটিয়া গিয়া ছবিটি গঙ্গায় বিসর্জন করে এবং আশ্রমে আসা বন্ধ করে। ঠাকুরের কপাল ভাল যে, ছবিটি আস্তাকুঁড়ে ফেলে নাই!
পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা!! সারা ভারত জুড়িয়া এই একটা রব উঠিয়াছে। শিক্ষা, সভ্যতা, সদাচার সব চুলায় গিয়াছে। এই বাতুলতা অবসানের কি কোন উপায় নাই?...স্বামীজী Man-Making Education-এর কথা বারংবার বলিয়াছেন এবং মানুষের ভিতরের পূর্ণতাকে শিক্ষার দ্বারাই বিকশিত করা সম্ভব। শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁহার এই বাণী বিশ্বাস করিলে এবং তাঁহার প্রদর্শিত পন্থায় নিজে চলিবার চেষ্টা করিলে, ইহা নিশ্চয়ই সম্ভব হইয়া উঠিবে।
(পূজ্য মহারাজের 'শিক্ষা : সামাজিক দায়বদ্ধতা' বই থেকে)
পরমপূজ্য স্বামী প্রেমেশানন্দজী মহারাজ।