ইচ্ছাদ্বেষসমুত্থেন দ্বন্দ্বমোহেন ভারত ।
সর্বভূতানি সম্মোহং সর্গে যান্তি পরন্তপ ॥ ৭.২৭ ॥
ইচ্ছা-দ্বেষো-সমুত্থেন
দ্বন্দ্ব-মোহেন ভা-র-ত ।
সর্ব-ভূ-তা-নি সম্মো-হং
সর্গে জান্তি পরন্তপ ॥
এই মন্ত্র রাহুজনিত মোহ, মানসিক দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্থিরতা কমাতে বিশেষ সহায়ক।
জ্যোতিষগত ব্যাখ্যা (অনুচ্ছেদ আকারে):
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সপ্তম অধ্যায়ের ২৭ নম্বর শ্লোকটি জ্যোতিষের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে উল্লিখিত ইচ্ছা ও দ্বেষ মূলত গ্রহজনিত মানসিক প্রবৃত্তির প্রতিফলন। কুণ্ডলীতে যখন রাহু-কেতু, চন্দ্র বা শুক্র দুর্বল, পীড়িত বা জলরাশিতে অশুভভাবে অবস্থান করে, তখন মানুষের মনে দ্বন্দ্ব, মোহ, বিভ্রান্তি ও ভুল সিদ্ধান্তের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। রাহু বিশেষভাবে মায়া, ভ্রান্ত আকাঙ্ক্ষা ও অযথা ভয়ের সৃষ্টি করে, শুক্র অতিরিক্ত কামনা ও ভোগবিলাস বাড়ায় এবং মঙ্গল দ্বেষ, রাগ ও প্রতিশোধপরায়ণতা জাগ্রত করে। এই গ্রহগুলির অশান্ত অবস্থার ফলে মানুষ জন্মগতভাবেই সংসার ও সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েনে পড়ে, যা শ্লোকের “সর্গে যান্তি সম্মোহং”—অর্থাৎ জন্ম থেকেই মোহগ্রস্ত হওয়ার বক্তব্যকে স্পষ্ট করে। জ্যোতিষ অনুযায়ী এই মোহই দুঃখের মূল, এবং কেবল বাহ্যিক প্রতিকার যথেষ্ট নয়; গ্রহশান্তির সঙ্গে সঙ্গে মন ও চেতনার শুদ্ধি জরুরি। তাই ভক্তি, জপ, নিয়মিত সাধনা ও সংযমের মাধ্যমে ইচ্ছা ও দ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই গ্রহের অশুভ প্রভাব ধীরে ধীরে প্রশমিত হয় এবং জীবনে স্থিতি ও সঠিক বোধের উদয় ঘটে।
জ্যোতিষগত প্রয়োগ
এই শ্লোকের মূল কথা ইচ্ছা (কামনা) ও দ্বেষ (বিরাগ)—যা গ্রহগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়
রাহু–কেতু (মোহ, বিভ্রান্তি, দ্বন্দ্ব)
শুক্র (ইচ্ছা, ভোগ)
মঙ্গল (দ্বেষ, ক্রোধ)
যাদের কুণ্ডলীতে রাহু/কেতু বা জলরাশিতে গ্রহের দোষ বেশি, তাদের জীবনে সিদ্ধান্তে দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মানসিক অস্থিরতা বেশি দেখা যায়। এই শ্লোক বোঝায়—গ্রহ দোষের মূলেও মনোজগতের মোহ কাজ করে। তাই শুধু প্রতিকার নয়, মন শুদ্ধ করাও জরুরি।
সোমবার বা অমাবস্যায়
“ওঁ নমঃ শিবায়” ১০৮ বার জপ
অথবা প্রতিদিন গীতা ৭ম অধ্যায় থেকে অন্তত ১টি শ্লোক পাঠ
এতে রাহুজনিত মোহ, মানসিক দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা ধীরে ধীরে কমে।
সংক্ষিপ্ত উপদেশ
মন্ত্রজপের সময় মনে রাখবেন: “আমি ইচ্ছা ও দ্বেষ নই, আমি তার সাক্ষী।”
৪২ বছরের আগে যাদের গৃহ, মা ও মানসিক শান্তি নিয়ে সমস্যা থাকে—তাদের জন্য এই সাধনা বিশেষ উপকারী।
বর্জনীয়
অতিরিক্ত তুলনা
“আমারটাই হওয়া উচিত” এই মানসিকতা
কাউকে ঘৃণা করে নিজেকে দোষী করা
আধ্যাত্মিক অর্থ
ভগবান কৃষ্ণ বলছেন—
মানুষ জন্মগতভাবেই মোহে পড়ে যায়, কারণ সে ইচ্ছা আর ঘৃণার মধ্যে দোল খেতে থাকে।
যা চাই → পেলে আসক্তি
যা না চাই → পেলে ক্রোধ বা দুঃখ
এই দ্বন্দ্বই আত্মাকে ঢেকে রাখে।
ভক্তি এই দ্বন্দ্ব ভাঙে,
জ্ঞান মোহ কাটায়,
বৈরাগ্য ইচ্ছা-দ্বেষকে শান্ত করে।
এই শ্লোক আমাদের শেখায়
সমস্যা বাইরে নয়, সমস্যার মূল ভিতরে।